একজন সজ্জন মানুষের আকস্মিক চলে যাওয়া

সংবাদ শেয়ার করুন
  • 194
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    194
    Shares

আবদুর রহমান জামী::

প্রতিটি চলে যাওয়াই কষ্টের। তবে কিছু কিছু চলে যাওয়া মেনে নিতে একটু বেশিই কষ্ট হয়। একজন মানুষ যেকোনো বয়সে মারা যাক সেটাকে ইসলাম ‘অকাল’ মৃত্যু বলে না। তবুও কিছু কিছু মৃত্যুকে মেনে নেয়া অসম্ভব কঠিন ব্যপার। মোজহারুল হোসেন আউয়াল সাহেবের চলে যাওয়াটাও তেমনি।তাকে যারা চিনেন, জানেন কেউই এ চলে যাওয়াকে সহজে মেনে নিতে পারছেন না। যদিও আল্লাহর ফায়সালার ওপর কারও কোনো হাত নেই।

০১ জানুয়ারি ২০২১ বিকাল ০২ টার দিকে বুকের ব্যাথা অনুভব করলে তার ১ম জামাতা খুবই দ্রুত সিলেট জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসা চলাকালীন সময়েই বিকাল ০৪ টায় সাবেক এই কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা চলে গেছেন না ফেরার দেশে! ইন্নালিল্লাহ——-রাজিউন!

তার আকস্মিক এ চলে যাওয়ার খবর স্বজনদের যেমন কাঁদিয়েছে, তেমনি শোকাহত করেছে চেনা-পরিচিত আর ভক্ত-অনুরাগীদের। একজন শিক্ষাবিদ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার অনুসারী-অনুরাগীর সংখ্যা অগণিত। তাদের সবার কাছেই এই মৃত্যুটি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো মনে হয়েছে। এই মৃত্যুর খবরে সবাইকে আফসোস করতে দেখা গেছে।
মোজহারুল হোসেন আউয়াল’র সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত চেনা-জানা খুব একটা ছিল না। ঘনিষ্ঠভাবে উঠা-বসার সুযোগও হয়নি। কয়েক মাস আগে সাক্ষাৎ হয়েছে সিলেটে তার বড়মেয়ের বাসায়। (তার বড়মেয়ের জামাতা নাসিমুল হক এক্সিম ব্যাংকের সিলেট জিন্দাবাজার শাখার এক্সিকিউটিভ অফিসার। মেয়েসহ সিলেটে থাকার কারণে তার সিলেটে আসা হয়।)

এর আগে তার স্ত্রী সৈয়দা শিরিন আক্তার’র সাথে আমার পরিচয় হয় ফেইসবুকে। কিছুদিনের মাঝেই আমরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই। এর ভেতরে একবার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে আমার সাথে।প্রথম আলাপে মনে হয়েছিল তিনি যেন আমাকে কতকাল থেকে চেনেন। প্রথম দেখাতেই তার আন্তরিকতা দেখে বিমুগ্ধ না হয়ে পারিনি। অত্যন্ত সজ্জন ও অমায়িক মানুষ ছিলেন। কথা বলতেন হাসিমাখা মুখে। চেহারায় একটা আভিজাত্য আর ব্যক্তিত্বের ছাপ ছিল।

তার স্ত্রী সৈয়দা শিরিন আক্তারের কবিতার বই ‘নীলকাব্য’ প্রকাশের সম্পদনার দায়িত্ব দেন আমাকে। এরপর থেকেই নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমার সাথে। প্রথম থেকেই ‘নানা’ বলে সম্ভোধন করতেন আমাকে। আমিও তাকে নানা ডাকতাম।কোনদিন আমাকে নাম ধরে ডেকেছেন বলে স্মরণ করতে পারছিনা।

সবশেষ গত ২৮ ডিসেম্বরে দেখা হয় সিলেটের আম্বরখানা জসিম বুক হাউজে। সেখান থেকে আমরা চলে যাই গোলাপগঞ্জে, গল্পকার নিশাত ফাতেমার বাসায়। নিশাত ফাতেমা পূর্বথেকেই আমাদেরকে দাওয়াত করেছিলেন তার বাসায় যাওয়ার জন্য। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা সিলেটের দিকে আসতে চাইলেও নিশাত ফাতেমা আমাদেরকে আসতে দেননি।তার আপ্যায়ন মুল্যয়ন কখনো ভুলার নয়। উনি আমাদের নিয়ে সন্ধ্যায় বের হলে গোলাপগঞ্জ পৌর শহরে। আনন্দে আমরা ঘুরে দেখেছি অনেক কিছু। এবং রাত্রি যাপন করি তার বাসায়।পরদিন সকালে খাওয়া-দাওয়া করে আমরা চলে আসি সিলেটে তার মেয়ের বাসায়।

পরদিন ৩১ডিসেম্বর বৃহঃবার। সন্ধ্যায় লন্ডন প্রবাসি কবি ফাহমিদা ইয়াসমিনের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিল জসিম বুক হাউজে। সেখানে আমার ও মরহুম মোজহারুল হোসেন আউয়াল এবং সৈয়দা শিরিন আক্তারের দাওয়াত ছিল। আমরা উভয়ে সময় মতো উপস্থিত হই।

অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সকলের সাথে আনন্দনের সাথেই কথা হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন আলোচনার ফাকে আমাদেরকে বলেছিলে, সাহিত্য বিষয়ে যেকোন প্রয়োজনে তাঁকে স্মরণ করতে। তার সেদিনের উদারতায় সত্যিই আমরা বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। এত শিক্ষিত ও জ্ঞানী একজন মানুষ, তবুও তার মধ্যে ছিল না কোনো অহংকার।
বিশেষ করে তিনি আলেম-উলামার সঙ্গে খুব ভালোভাবে মিশতেন। আলেমদের সঙ্গে সম্পর্কটা তিনি মূলত পারিবারিকভাবেই পেয়েছিলেন।পরিচয়ের প্রসঙ্গে সিলেটের “দুলাভাই” লকব দিলেন জসিম বুক হাউজ সাহিত্য সেবার সভাপতি; ছয়ফুল আলম পারুল।অনুষ্টানের উপস্থিত সকলকে তিনি চা-য়ের আপ্যায়ন করলেন।আমরাও তার আপ্যায়ন গ্রহন করে অনেক আনন্দের সাথে চা-য়ের আড্ডা শেষে যার যার গন্তব্যে চলে যাই!

পরদিন ১জানুয়ারি শুক্রবার। বিকাল ০৪ টায় আমার নাম্বারে ফোন আসে তার স্ত্রীর মোবাইল থেকে। মোবাইলের পাশে না থাকায়, আধাঘণ্টা পরে আমি কল ব্যাক করি। ফোন রিসির্ভ করতেই ওপর পাশথেকে কান্নার আওয়াজ শুনি!
কয়েকবার কথা বলার পর জানতে পারি উনি আর নেই! ইন্নালিল্লাহি———- রাজিউন!

মোজহারুল হোসেন আউয়াল’র গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগর উপজেলার গুনিয়াউক গ্রামে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বি-বাড়ীয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক।অবসরপ্রাপ্ত হওয়ার পরে, ব্রাক্ষণবাড়ীয়ায় লিবার্টি হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ডিরেক্টর ফাইনেন্স।

তার বয়স ৬৫ এর কোটা স্পর্শ করার আগেই তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার এ চলে যাওয়া যত কষ্টের আর আফসোসেরই হোক, তিনি আর আসবেন না এটা চিরন্তন সত্য। পৃথিবীর অমোঘ বিধান এটাই, যারা চলে যায় আর ফিরে আসে না। আমরা শুধু তার জন্য দোয়া করতে পারি, আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।

লেখক: সম্পাদক, মাসিক অক্ষর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *